লেবু ভিটামিন সি এর ভান্ডার। আর ভিটামিন সি স্বাস্থ্যের জন্য প্রচুর উপকারী। শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং রোগ মুক্ত জীবন যাপন করতে ভিটামিন সি এর বিকল্প নেই। অন্যান্য ফলের তুলনায় লেবুতে ভিটামিন সি এর পরিমাণ অনেক বেশি। এছাড়া মানব শরীরের জন্য অনেক প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান লেবুর মধ্যে বিদ্যমান। তাই নিয়মিত লেবু খেলে অনেক রোগ থেকে দূরে থাকা যায়। আপনি হয়তোবা লেবুর উপকারিতা না জেনে লেবু খান অথবা কিছু উপকারিতা জানেন কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ লেবুর সব উপকারিতা জানেন না। এই আর্টিকেলে আজ আমি লেবুর উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করব। আপনি আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন এবং লেবু আপনাকে কোন কোন রোগ থেকে রক্ষা করবে সেটা জানুন। এর পূর্বে লেবুর মধ্যে কি কি পুষ্টি উপাদান আছে সেটা এক নজরে দেখে নিন।
লেবুর উপকারিতা ও অপকারিতা
লেবুর পুষ্টি উপাদান:
ভিটামিন-সি ছাড়াও লেবুর মধ্যে আছে ভিটামিন এ, ভিটামিন
বি ৬, ভিটামিন ই, সাইট্রিক এসিড, প্যানটোথেনিকঅ্যাসিড, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, দস্তা, ফোলেট, তামা, নিয়াসিন, থায়ামিন
এবং আরও অনেক ধরনের প্রোটিন রয়েছে। এছাড়াও এতে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পলিফেনলস, টের্পেনস
ও ট্যানিন সহ অসংখ্য ফাইটোকেমিক্যাল, অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল, এন্টি-ভাইরাল
গুনাগুন যা বিভিন্ন রোগব্যাধি প্রতিকার ও প্রতিরোধে ভালো ভূমিকা পালন
করে।
লেবুর উপকারিতা
উপরের লেবুর পুষ্টি উপাদানগুলো দেখে এটাই প্রমাণিত হয়
যে লেবু মানব শরীরের জন্য একটা মহা এন্টিবায়োটিক। তারপরও বিশেষভাবে লেবু মানুষের কি
কি মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে এখন সে বিষয়টা জানা যাক।
১। শরীরের মধ্যে প্রচন্ডভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
করে।
২। হাই ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ করে।
৩। শরীরের বাড়তি ওজন কমায়।
৪। মানসিক চাপ কমায়।
৫। শরীরের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ফলে স্ট্রোকের
ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
৬। ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
৭। চুলপড়া বন্ধ করে এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।
৮। দাঁত শক্ত ও মজবুত রাখে।
৯। কালো ত্বককে উজ্জ্বল করে।
১০। হাঁপানি কিংবা শ্বাসকষ্ট প্রতিরোধ করে।
১১। যে কোন প্রকার ক্ষত নিরাময় করে।
১২। রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করে।
১৩। পাকস্থলী সুস্থ রাখে।
১৪। গলার যে কোন প্রকার সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
১৫। মুখের দুর্গন্ধ দূর করে।
১৬। মুখের কালচে দাগ বিলীন করে দেয়।
১৭। ব্রণ সমস্যার সমাধান করে।
১৮। ঠোঁটের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
১৯। নখ সুন্দর রাখে।
২০। দাগ ও চুলকানিসহ যে কোন খোস পাঁচড়া থেকে দূরে রাখে।
লেবুর খোসার উপকারিতা
কথায় বলে বাশের চেয়ে কঞ্চি টোংক। ঠিক তেমনি লেবুর চেয়ে
লেবুর খোসার উপকারিতা অনেক বেশি। লেবুর খোসায় থাকে ভিটামিন সি, সাইট্রিক অ্যাসিড, সাইট্রাস
বায়ো ফ্লেভোনয়েড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, সয়ালভেসস্টুল কিউ ৪০, লিমোনেন্স, প্য়কটিন, ডায়েটরি
ফাইবার ইত্যাদি।
তাই আমরা এখন লেবুর খোসার উপকারিতা জেনে নিব। প্রকৃতপক্ষে
বেশিরভাগ মানুষ লেবুর খোসার উপকারিতা না জানার কারণে লেবুর খোসা ফেলে দিয়ে শুধুমাত্র
লেবু খায়। ঠিক যেন দুধ বেচে ঘোল কেনার মত অবস্থা। তাহলে এখন লেবুর খোসার উপকারিতা সম্পর্কে
জানা যাক।
১। হার্টের ক্ষমতা বাড়ায়।
২। লিভার ভালো রাখে।
৩। স্ট্রেস কমায়।
৪। হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।
৫। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
৬। শরীরের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে।
৭। ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে।
৮। পাকস্থলীর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।
৯। যেকোনো ব্যথা নিরাময় করে।
১০। শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয়।
১১। ত্বক উজ্জ্বল করে এবং ত্বকের বলিরেখা দূর করে।
১২। শরীরের চর্বি কমায়।
১৩। কিডনি থলিতে পাথর পড়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়ে।
১৪। ব্যাকটেরিয়া এবং ফাংগাল ইনফেকশন থেকে দূরে রাখে।
১৫। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করে।
লেবু খাওয়ার নিয়ম
পৃথিবীতে বহু ধরনের লেবু পাওয়া যায়। কাগজি লেবু, পাতি
লেবু, কমলা লেবু ও বাতাবি লেবু তার মধ্যে অন্যতম। এসব লেবু বিভিন্নভাবে খাওয়া
যায়। তবে লেবুর মধ্যে সবচেয়ে কাগজি লেবুর ভূমিকা অনেক বেশি। এই কাগজি লেবু আপনি কয়েকটি
উপায় খেতে পারেন। চলুন এখন লেবু খাওয়ার নিয়মটা দেখে নেওয়া যাক।
তিন বেলা ভাত খাওয়ার সময় পাতে অবশ্যই লেবু রাখেন এবং রস
বের করে ভাত ও তরকারীর সাথে মিশিয়ে খান।
লেবু আপেলের মত করে খণ্ড-খণ্ড করে কেটে ফেলুন। প্রতি খন্ডের দুই
পাশ দিয়ে হালকা লবন লাগিয়ে খান।
সকাল-বিকাল চা খাওয়ার সময় সাথে লেবুর রস মিশিয়ে খান।
সকালে খালি পেটে এক গ্লাস উষ্ণ গরম পানি, এক চামচ লেবুর
রস ও এক চামচ মধু মিশিয়ে খান। সারাদিন শরীরে এলার্জির ঘাটতি হবে না এবং ওজন কমাতে
বিরাট ভূমিকা রাখবে।
লেবু দিয়ে ওজন কমানোর উপায়
শরীরের বাড়তি ওজন কমানোর জন্য লেবু একটি অন্যতম প্রাকৃতিক
উপাদান। তাই কেউ ওজন কমাতে চাইলে নিয়মিত সকালে খালি পেটে মধু ও লেবুর রসের মিশ্রণ
অথবা জিরা পানি ও লেবুর রস মিশ্রণ খান। ওজন কমানোর জন্য মধু ও লেবুর রস এর মিশ্রন তৈরী
করতে ২৫০ গ্রাম উষ্ণ গরম পানি, এক চা চামচ লেবুর রস ও এক চা চামচ মধু
একসাথে মিশিয়ে সকালে খালি পেটে খান। আর ওজন কমানোর জন্য জিরা পানি তৈরি করতে দুই চামচ
জিরা ৩০০ গ্রাম পানির সাথে দিয়ে ফুটিয়ে নিন। এরপর পানি ঠান্ডা হলে পানিটুকু
ছেকে নিয়ে তার সাথে এক চামচ লেবুর রস মিশিয়ে খেয়ে ফেলুন। নিয়মিত সকালে অথবা
রাতে লেবু পানির এই মিশ্রণ পান করুন। এক সপ্তাহের মধ্যে আপনার ওজন কমে যাবে।
লেবু দিয়ে চুল সিল্কি করার উপায়
লেবুর রস চুলের জন্য খুব উপকারী। নিয়মিত চুলে লেবুর রস ব্যবহার
করলে চুল সিল্কি হয়, চুল পড়া বন্ধ হয় এবং মাথায় চুল বৃদ্ধি পায়। তাই চুলের যত্নে
লেবুর রসের প্যাক ব্যবহার করতে পারে। এখন কিভাবে চুলে লেবুর রসে প্যাক ব্যবহার করবেন
এটা দেখে নিন।
লেবুর রসের প্যাক-১: এক চা চামচ লেবুর রস, এক
চা চামচ মধু ও এক চা চামচ অলিভ অয়েল একসাথে মিশিয়ে লেবুর রসের প্যাক বানিয়ে
ফেলুন। এরপর এই প্যাক চুলে লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন এবং তারপর শ্যাম্পু
করে ফেলুন। নিয়মিত কিছুদিন ব্যবহার চালিয়ে যান। ভাল ফলাফল পাবেন।
লেবুর রসের প্যাক-২: প্রথমে একটা ডিম ফেটিয়ে নিন।
এরপর এর সাথে এক চা চামচ অলিভ অয়েল ও এক চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে লেবুর রসের প্যাক
তৈরি করে। এখন এই প্যাক চুলে লাগিয়ে আধা ঘন্টা অপেক্ষা করুন।
এরপর শ্যাম্পু করে ফেলুন।
লেবুর রসের প্যাক-৩: এক চামচ লেবুর রস ও এক চামচ নারিকেলের
তেল একসাথে মিশিয়ে লেবুর রসের প্যাক-৩ তৈরি ফেলুন। এরপর এই প্যাক চুলে লাগিয়ে ১০ মিনিট
পরে ধুয়ে ফেলুন।
এছাড়া শুধুমাত্র লেবুর রস চুলের গোড়ায় ম্যাসেজ করতে পারেন।
এতেও একই ধরনের ফলাফল পাবেন। চুলে লেবুর রসের এই প্যাক ব্যবহার করলে চুল প্রচুর
পরিমাণে পুষ্টি পাবে। ফলে চুল সিল্কি হবে, চুল পড়া বন্ধ হবে এবং নতুন নতুন
চুল গজিয়ে মাথায় চুল বৃদ্ধি পাবে।
লেবু দিয়ে ফর্সা হওয়ার উপায়
ত্বক ফর্সা, উজ্জ্বল ও কোমল করতে লেবুর জুড়ি নেই। লেবু
ত্বকের মৃত কোষগুলো জীবিত করে ত্বকের উজ্জ্বাল্য ফিরিয়ে নিয়ে আসে। তাই ত্বকের যত্নে
কসমেটিকস বাদ দিয়ে লেবুর প্যাক ব্যবহার করুন। এখন দেখে নিন কিভাবে লেবুর প্যাক তৈরি
করতে হয়।
প্রথমে একটি লেবুর খোসা কুচি কুচি করে নিন। এরপর এর সাথে চার-পাঁচটি
পুদিনা পাতা, চার-পাঁচটি তুলসী পাতা ও এক চা চামচ মুলতানি মাটি একসাথে
মিশিয়ে ব্লেন্ডার করে নিন অথবা পাটায় পিষে পেস্ট তৈরি করুন। এরপর সব পেস্টটুকু মুখের
ত্বকে লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর কুসুম গরম পানি দ্বারা ভালোভাবে
মুখ ধুয়ে ফেলুন। ১৫ দিন এই প্যাক ব্যবহার চালিয়ে যান। মুখের ত্বক উজ্জ্বল
হবেই।
একটি ডিমের কুসুম, এক চা চামচ মধু, দশ ফোটা জলপাই
তেল, ২ চা চামচ গমের আটা বা ময়দা এবং এক চা চামচ লেবুর রস নিন। এরপর এইসব
উপাদানগুলো একসাথে মিশিয়ে একটি প্যাক তৈরি করে নিন এবং এই প্যাক মুখে লাগান। ২০ মিনিট
পরে ধুয়ে ফেলুন। এভাবে সপ্তাহে দুই-তিনবার এই প্যাক ব্যবহার করুন। এই প্যাক ব্যবহারের
ফলে ত্বক উজ্জ্বল হবে এবং ত্বকের বলিরেখা দূর হবে।
এক চামচ লেবুর রস ও এক চা চামচ মধু নিন। এরপর লেবুর রস মধু
ভালোভাবে মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে রাখুন। শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সম্পূর্ণ শুকিয়ে
গেলে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এক সপ্তাহ ব্যবহারের পরে দেখবেন মুখের ত্বক অনেক উজ্জ্বল হয়েছে।
এক চা চামচ লেবুর রস ও পাঁচ চা চামচ দুধ একসাথে মিশিয়ে
এটি দ্বারা সমস্ত মুখের ত্বকে ম্যাসাজ করুন। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে
মুখের ত্বকের তৈলাক্ত ভাব দূর হয়ে ত্বক সতেজ হবে।
একটি ডিমের সাদা অংশ নিন। এর সাথে এক চা চামচ কাগজি লেবুর
রস এবং এক চা-চামচ কমলালেবুর রস মেশান। একসাথে অল্প উষ্ণ গরম পানি যোগ করুন।
এখন মিশ্রণটি ত্বকে লাগিয়ে ২০ মিনিট পরে ধুয়ে ফেলুন। এটি ব্যবহারে ত্বকের
তৈলাক্ত ভাব কেটে যেয়ে ত্বক হবে আরো সুন্দর আরো উজ্জ্বল।
লেবুর অপকারিতা
লেবুতে হাজার উপকারিতা থাকার সত্বেও কিছু অপকারিতা তো আছে।
আসলে লেবুতেএসিডের পরিমাণ খুব বেশি। তাই মাত্রাতিরিক্ত লেবু খেলে বা ব্যবহার করলে ক্ষতি
হতে পারে। মাত্রা অতিরিক্ত লেবু খাওয়ার ফলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়ে যেতে পারে। ঘন
ঘন প্রসাব হতে পারে। এমনকি মাইগ্রেনের সমস্যাও দেখা যেতে পারে। তাই কেউ মাত্রাতিরিক্ত
লেবু না খেয়ে নিয়মিত পরিমিত লেবু খাওয়া উচিত। এতে কোনো ক্ষতি হবে
না বরং লেবু আপনার শরীরের গার্ড হয়ে দাঁড়াবে।
উপরের আলোচনা থেকে এটাই সিদ্ধান্তে আসা যাওয়া যে সামান্য অপকারিতা থাকার সত্বেও লেবুর উপকারিতা অপরিসীম। তাই তিনবেলা খাওয়ার সময় তাতে অবশ্যই লেবু রাখুন এবং প্রতিদিন সকালে নাস্তা খাওয়ার পূর্বে এক গ্লাস লেবু ও মধু মিশ্রিত পানি পান করুন। এতে সারাদিন কাজ কর্মে শরীরে এনার্জির অভাব হবে না। এমনকি কোন কাজ করার সময় কষ্ট অনুভব করতে পারবেন না। তাই নিয়মিত লেবু খান এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সুস্থ জীবন যাপন করুন।